শিরোনাম
আল্লামা শফীর ১৩ দফা বাস্তবায়নে পুনরায় সক্রিয় হচ্ছে হেফাজত সরকারবিরোধী আন্দোলন : বিএনপি নেতাকর্মীরা চাঙা তিন কারণে নারায়ণগঞ্জে আবারো গলাকাটা লাশ উদ্ধার গুলিস্তানে তৈরি হতো ফোন, লেখা ‘মেড ইন চায়না-ফিনল্যান্ড’ বাংলাদেশকে ২৮৫৪ কোটি টাকা ঋণ দিলো বিশ্বব্যাংক ইউক্রেনকে অস্ত্র দেয়া বন্ধ করুন: পশ্চিমা বিশ্বকে ব্রিটিশ রাজনীতিক টাঙ্গাইলে বাবাকে মেরে মসজিদের মাইকে প্রচার, ছেলে আটক খুলনা-মংলা পোর্ট রেলপথ ডিসেম্বরে চালু হবে : রেলপথ মন্ত্রী আয়মান আল-জাওয়াহিরি: আল-কায়েদা নেতা মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন বলে খবর প্রচার বিবিসির আমেরিকাকে সরাসরি রাশিয়ার ‘প্রধান হুমকি’ বলে ঘোষণা দিল মস্কো
শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:১৩ পূর্বাহ্ন

মেহেদীর রঙ

উবাইদুল্লাহ জাফর / ৪৫ পঠিত
প্রকাশের সময় : বুধবার, ৪ মে, ২০২২

ছেলেটা দৌড়াচ্ছে। পেছনে উদ্গ্রীব জনগণ। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে ছেলেটা দোষী। পেছনের লোকেরা তাকে অকথ্য ভাষায় গাল দিচ্ছে। সেদিকে কোনো‌ ভ্রুক্ষেপ‌ নেই তার। সে ছুটছে পিচঢালা প্রান্তর মাড়িয়ে।

মজনু মিয়া ঠেলাগাড়ি চালান। চার সদস্যের ছোট্ট সংসার তাঁর। একটি ছেলে। নাম শুভ। চার বছর বয়সী একটি মেয়েও আছে। নাম সাদিয়া। এবং তার জীবনসঙ্গিনী কমলা বেগম। থাকেন কাঁচাবাজারের পেছনের বস্তিটায়। সারাদিনে মজনু মিয়া যা আয়-রোজগার করেন — চাল, ডাল কিনতেই সব চলে যায়। তার ওপর দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতিতে আরো বিপাকে পড়েছেন মজনু মিয়া। আর্থিক টানপোড়েন থাকলেও এ পরিবারের আত্মমর্যাদাবোধ খুব বেশি। কখনো কারো দ্বারে হাত পাতেন না তারা। কামাই হলে খায়। না হলে ভুখা যায়। খুবই শরিফ মানুষ মজনু মিয়া। প্রতিদিনের মতো আজও ঠেলাগাড়ি নিয়ে বের হলেন তিনি।

সামনে ঈদ। ছেলেকে না কিছু দিলেও ছোট মেয়েকে অন্তত কিছু দিতেই হয়। মজনু মিয়ার মাথায় সারাক্ষণ এসব চিন্তাই ঘুরপাক খায়। মেয়েটা মাঝে মাঝে মজনু মিয়ার গলা জড়িয়ে গালে আলতো চুমু দিয়ে মিষ্টি করে বলে—‘ আব্বু আব্বু! এবাল কিন্তু আমাল একতা মেহেদি তাই। কাতের তুড়ি কিনে দিবা। আমি হাতে দিয়ে ঘুলবো!’ পাশেই থাকে শুভ। ছোট বোনের ফোকলা দাঁতের তোতলা কথায় ফিক করে হেসে দেয় সে। মজনু মিয়া মেয়েকে কোলে বসিয়ে দু’গালে এঁকে দেয় স্নেহের পরশ। মজনু মিয়া এমন ছোট ছোট সুখ থেকে শক্তি খোঁজে পান। আজ তেমন কাজ পাচ্ছেন না। নিচ দিকে তাকিয়ে বিষণ্ন মনে ঠেলাগাড়ি নিয়ে হাঁটছেন হাইওয়ের মাঝখান দিয়ে। অন্যদিকে কোনো খেয়াল নেই তাঁর —“ মেয়েকে যে মেহেদী আর চুড়ি কিনে দিতেই হবে। এদিকে বউটারও একটা ভালো শাড়ি নেই। ছেলেকে ক’দিন আগে নতুন জামা দেয়া হয়েছে। এখন না দিলেও চলবে।” আজ মজনু মিয়ার ভাবনা জুড়ে এসব। এদিকে তিনি বে-খেয়ালে ঢুকে পড়েছেন চলার উল্টোপথে। সামনের দিক থেকে গাড়িগুলো পাশ কেটে যাচ্ছে। কোনো কোনো ড্রাইভারের শেন্যদৃষ্টি ভেদ করছে তাঁকে। সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই তাঁর। হঠাৎ একটা ট্রাক ধাক্কা দিয়ে চলে যায় মজনু মিয়াকে। ভাবনাগুলো উড়ে যায় আকাশে। ঠেলাগাড়ির পাশেই পড়ে থাকে একজন ভাবনাহীন মানুষের লাশ। নিস্তব্ধ তাঁর দেহ। চেহারায় কালশিটে পড়ে গেছে। ঠিকমতো চেনা যাচ্ছে না চেহারা। রক্তের বানে ভেসে যাচ্ছে পিচঢালা সরণি।

মজনু মিয়ার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। শুভ কাজের জন্য ঘুরে মানুষের দ্বারে দ্বারে। বয়সে ছোট হওয়ায় কেউ তাকে কাজ দেয় না। এদিকে ছোট বোনটা আর কী বোঝে! মাঝে মাঝে তার মাকে বলে —‘ মা মা! আব্বু কোথায়? আমাকে মেহেদি কিনে দেবে না!’ কমলা বেগম শাড়ির আঁচলে মুখ লুকায়। ছোট্ট মেয়ের দৃষ্টির আড়াল হতেই এ ব্যর্থ চেষ্টা। কোথাও কোনো কাজ না পেয়ে অবশেষে নিষিদ্ধ জগতে পা বাড়ায় শুভ। পেট বাঁচাতে কিছু তো করতেই হবে তাকে। আজ এক ভদ্র লোকের মানিব্যাগ ছিনতাই করেছে শুভ। বিক্ষুব্ধ জনতা তার পিছু পিছু ছুটছে। শুভও দৌড়াচ্ছে। তাকে দৌড়াতেই হবে। আরো দ্রুত। বোনটার ছোট ছোট হাত দুটো রাঙাতেই হবে ‘মেহেদির রঙে।’

নাটোর, রাজশাহী।

উৎসর্গ— হাসান পারভেজ। পথশিশুদের সেবায় যিনি নিবেদিত। আহার তুলে দেন অসহায়, দরিদ্র, মজনু মিয়াদের মতো আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন লোকদের মুখে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ