শিরোনাম
মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ০৯:৪২ অপরাহ্ন

মসজিদ যখন গির্জায় রুপান্তর!

/ ৪০৩ পঠিত
প্রকাশের সময় : রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

তক্বী খালেদ


পৃপৃথিবীর ইতিহাসে স্পেনে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়েছিল মুর জাতির মাধ্যমে। তারা রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছিল কর্ডোভা নগরীকে। ৭১১ থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত মুসলিম শাসনামলে সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায় স্পেন। এ সময় স্পেনে শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটে। নির্মিত হয় অনেক লাইব্রেরি, হাম্মাম (গোসলখানা) ও মসজিদ। অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যে তৈরি অসংখ্য মুসলিম স্থাপনা যে কোনো মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিতে সক্ষম। এসব স্থাপনার মধ্যে কর্ডোভা মসজিদ অন্যতম। লিখেছেন আন্দালিব আয়ান স্পেনে মুসলিম শাসন

৭১১ সালে স্পেন জয় করার জন্য মুসলিম শাসক মুসা বিন নুসায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন তার সেরা সেনাপতি তাঞ্জিয়ার্সের তৎকালীন গভর্নর তারিক বিন জিয়াদকে। তারিক সদ্য ইসলাম গ্রহণ করা ৭ হাজার সৈন্য নিয়ে পাড়ি জমালেন হিস্প্যানিয়ার উদ্দেশে। এই বাহিনীর সঙ্গে যোগ হয়েছিল মুসা বিন নুসায়েরের আরও ৫ হাজার সৈন্য। তারিকের বাহিনী মূলত মরক্কোর মুর জাতি দ্বারা গঠিত হয়েছিল। তারিক ছিলেন মুসা বিন নুসায়েরের একজন দাস, পরবর্তী সময়ে মুসা তাকে মুক্ত করে সেনাপতি বানান।

৭১১ সালের এপ্রিল ২৬ তারিক বিন জিয়াদ তার বাহিনী নিয়ে জিব্রাল্টারে পা রাখলেন। ক্ষুদ্র এই বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য ভিজিগথ রাজা রডারিক জড়ো করেছিলেন প্রায় এক লাখ সৈন্য। এমন অবস্থায় তারিক আদেশ দিলেন পেছনে থাকা নিজেদের সব জাহাজ পুড়িয়ে দিতে। পরে তিনি তার সৈন্যদের উদ্দেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তারিক বলেছিলেন, ‘হে আমার সৈন্যরা, তোমরা পালাবে কোথায়? তোমাদের পেছনে সাগর, তোমাদের সামনে রয়েছে অগণিত শত্রু। আর জীবন বাঁচানোর জন্য তোমাদের কাছে রয়েছে শুধু তলোয়ার। মনে রেখো এই অসাধারণ যুদ্ধে আমিই সবার সামনে থাকব যা তোমরা করতে যাচ্ছো।’

তারিকের ভাষণ শুনে উজ্জীবিত সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ল রডারিকের বিশাল বাহিনীর ওপর। রডারিকের বাহিনী তখন দ্বিধাবিভক্ত, নিজেদের সুরক্ষিত শহর ছেড়ে এই প্রান্তরে যুদ্ধ করতে এসে যারপরনাই বিরক্ত সামন্ত রাজারা। তাছাড়া এই বিশাল বাহিনী রডারিকের অনুগতও নয়। এই সুযোগটাই কাজে লাগাল মুসলিমরা। অসাধারণ রণকৌশলে মুহূর্তের মধ্যেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল ভিজিগথ বাহিনী। গুয়াদেলেতের যুদ্ধে নিহত হলো রডারিক, হিস্প্যানিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হলো মুসলিম শাসন। এভাবে জিব্রাল্টার থেকে দক্ষিণ ফ্রান্স পর্যন্ত মুসলিমদের দখলে চলে এলো। দশম শতাব্দীর মধ্যেই আল-আন্দালুস পরিণত হলো ইউরোপ, আফ্রিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্র হিসেবে। পণ্ডিতরা চর্চা করতে থাকলেন বিজ্ঞান-দর্শনশাস্ত্রের, থেমে যাওয়া প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞান আবারও আলোর মুখ দেখল তাদের হাত ধরে।

পূর্বের আরব রাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোকে সবদিক থেকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিল আল-আন্দালুস। রোমানদের কাছ থেকে ধার নেওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং আর শহরের পরিকল্পনার সঙ্গে ইসলামি স্থাপত্যকলা মিশিয়ে নতুন করে গড়া হলো আন্দালুসের শহরগুলো। ভ্যালেন্সিয়া আর সেভিল ছিল বর্তমানের দুবাই কিংবা দোহার মতো বিলাসবহুল শহর। শহরে শহরে তৈরি করা হলো হাম্মামখানা, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। নারীরা, বিশেষ করে অভিজাতরা মধ্যযুগীয় খ্রিস্টানদের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করত। এ অবস্থায় ধর্মান্তরিত না হওয়া খ্রিস্টান আর ইহুদিরাও কিছুটা ইসলামি সংস্কৃতিতে প্রভাবান্বিত হয়েছিল। তৎকালীন বেশ কিছু খ্রিস্টান সূত্রমতে, আন্দালুসের খ্রিস্টান যুবকদের অনেকেই আরব কবিদের সাহিত্যকর্ম আয়ত্ত করেছিল, এমনকি কোরআনও মুখস্থ করেছিল।

বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ আর ইহুদি দার্শনিক মাইমোনাইডসের জন্মই হয়েছে আন্দালুসে। ক্লাসিক আরবি আর হিব্রু সাহিত্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় আইবেরীয় লোকগান আর কবিতাগুলো। সেভিল, কর্ডোবা কিংবা গ্রানাডার বাড়িঘরের দেয়ালে এখনো চোখে পড়ে আরবি ক্যালিওগ্রাফি আর জ্যামিতিক নকশাগুলো। জ্ঞান-বিজ্ঞানেও সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল আন্দালুসীয়রা।

জ্ঞানবিজ্ঞানের স্বপ্নপুরী কর্ডোভা

জ্ঞানবিজ্ঞানে কর্ডোভার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। এই নগরীর প্রত্যেক নরপতিই ছিলেন বিদ্যানুরাগী ও জ্ঞানসেবক। জ্ঞানবিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কর্ডোভাই ছিল ইউরোপের পথপ্রদর্শক। প্রখ্যাত মুসলিম ভূগোল বিশারদ ইয়াকুত আল হামাবির মতে, কর্ডোভা ছিল গোটা আন্দালুসের প্রাণকেন্দ্র।

স্পেন মুসলিমদের প্রথম করতলগত হয় মুর জাতির মাধ্যমে। মুসলিমরা বিজিত ভূখ-ের রাজধানী হিসেবে কর্ডোভাকেই বেছে নেয়। শুধু ভূখ-ের দখল নয়, বরং এর সার্বিক উন্নয়নের প্রতি পুরো মনোনিবেশ করেন মুসলিম শাসকরা।

খলিফাদের নিয়োগ করা মোট তেইশ জন প্রশাসক এই ভূখ- শাসন করেছিলেন। তবে ৭১৬ সালে এটি দামেস্কের কেন্দ্রীয় খেলাফতের অধীনে চলে যায়। পরে ৯২৯ থেকে ১০৩১ পর্যন্ত এখানেই একটি স্বতন্ত্র খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময় পরিসরকেই কর্ডোভার ঐশ্বর্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের সোনালি যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।

একাদশ শতাব্দীতে জ্ঞানবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি সর্বক্ষেত্রেই কর্ডোভা হয়ে উঠেছিল গোটা বিশ্বের অগ্রণী নগর। ইউরোপের বহু খ্রিস্টান বিদ্যা অর্জনের জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন এই নগরীতে। তাদের অনেকে পেশাজীবী হিসেবে এই শহরেই বাস করতেন। অনেকে এখান থেকে বিদ্যা আহরণ করে পিরেনিজ পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে চলে যান ইউরোপে। তখন তারাই হয়ে যান অবশিষ্ট ইউরোপের মহাজ্ঞানী। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের শিল্প, সাহিত্য ও সভ্যতায় সেকালের কর্ডোভার প্রভাব পরিদৃষ্ট হয়। নগর সভ্যতার এতটা উৎকর্ষ সে কালের আর কোনো নগরীর ভাগ্যে জোটেনি। সে সময় গোটা কর্ডোভায় পাঁচ শতাধিক লাইব্রেরি ছিল। তৎকালীন ইউরোপে গোসলখানাকে নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হতো, অথচ কর্ডোভাতে ছিল ৯০০ পাবলিক বাথ। দশম শতকে কর্ডোভাতে ছিল ৭০০ মসজিদ।

শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান সাধনায় নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নেও কর্ডোভা ছিল সেকালের রোল মডেল। চামড়া, লোহা, সুতা, রেশম এবং বস্ত্রসহ বহুমুখী উৎপাদনের কেন্দ্রও ছিল এই কর্ডোভা। ইউরোপের বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের কাপড় তৈরি হতো এই ভূখণ্ডেই। কৃষি খাতেও কর্ডোভা ছিল বহু এগিয়ে। সেকালের চাকা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেচ কাজ পরিচালিত হতো। মরুময় আরবের কঠোর পরিশ্রমী জাতি এখানে সোনার ফসল ফলাতে লাগল। নানা ধরনের সবজি ও ফলফলাদি বেশ সহজেই উৎপাদন হচ্ছিল। এসব উৎপাদন কর্ডোভার অর্থনীতিকে বহুদূর এগিয়ে নিয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বায়ুকলের ব্যবহার গোটা ইউরোপের মাঝে এই ভূখণ্ডেই সর্বপ্রথম হয়েছিল।

কর্ডোভা মসজিদের নির্মাণ

খলিফা প্রথম আব্দুর রাহমানের শাসনামলে ৭৮৪ থেকে ৭৮৬ সালে আন্দালুসিয়ার কর্ডোভায় নির্মিত হয় ঐতিহাসিক কর্ডোভা মসজিদটি। পরে অন্যান্য শাসকের মাধ্যমে মসজিদের সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধন ঘটে। স্প্যানিশ ভাষায় মসজিদকে বলা হয় ‘মেজিকেতা’। তাই স্প্যানিশ ভাষায় এই মসজিদ লা মেজিকেতা নামে পরিচিত। কর্ডোভা মসজিদটি মুরিশ স্থাপত্যের সর্বাপেক্ষা নিখুঁত স্তম্ভগুলোর মধ্যে একটি। স্থাপনের পর প্রায় পাঁচশ বছরেরও বেশি সময় এ মসজিদে নামাজ আদায় করেন মুসলমানরা। সে সময় মসজিদটি ইসলামি শিক্ষা, শরিয়া আইন ও সালিশ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তারপর ক্যাসলের রাজা তৃতীয় ফার্দিনান্দ ও রানী ইসাবেলা ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানদের পরাজিত করে স্পেন দখল করলে পাল্টে যায় কাহিনী।

স্থাপত্য কৌশল

১ লাখ ১০ হাজার ৪০০ বর্গফুট আয়তনের মসজিদটির নকশা করেন একজন সিরিয়ান স্থপতি। এর থামের সংখ্যা ৮৫৬টি। এছাড়াও ৯টি বাহির দরজা ও ১১টি অভ্যন্তরীণ দরজা রয়েছে। লাল ডোরাকাটা খিলানগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় স্থাপত্যশিল্পে মুসলিম পা-িত্যের কথা।

অনিন্দ্য সুন্দর এই মসজিদের থামগুলো নির্মিত হয়েছে মার্বেল, গ্রানাইট, জেসপার, অনিক্স পাথর দিয়ে। পরে নতুন করে সংস্কার করে সোনা, রুপা ও তামাসহ অনেক মূল্যবান উপাদান ব্যবহার করে এর সৌন্দর্য আরও বাড়ানো হয়।

কর্ডোভা মসজিদ নির্মাণে সেকালেই আড়াই থেকে তিন লাখ মুদ্রা ব্যয় করা হয়েছিল। পূর্ব-পশ্চিমে এর দৈর্ঘ্য ছিল ৫০০ ফুট। এর সুন্দর ও আকর্ষণীয় মিহরাবগুলো স্থাপিত ছিল পাথরের নির্মিত এক হাজার ৪১৭টি স্তম্ভের ওপর। মিহরাবের কাছে একটি উঁচু মিম্বর ছিল হাতির দাঁত ও ৩৬ হাজার বিভিন্ন রং ও বিভিন্ন কাষ্ঠখ-ের তৈরি। সেগুলোর ওপর ছিল হরেক ধরনের হীরা-জহরতের কারুকাজ। দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রমে মিম্বরটি নির্মাণ করা হয়। তৈরি করা হয় ১০৮ ফুট উঁচু মিনার, যাতে ওঠানামার জন্য নির্মিত দুটি সিঁড়ির ছিল ১০৭টি ধাপ। মসজিদের মধ্যে ছোট-বড় ১০ হাজার ঝাড়বাতি জ্বালানো হতো। তার মধ্যে সর্ববৃহৎ তিনটি ঝাড়বাতি ছিল রুপার, বাকিগুলো পিতলের তৈরি। বড় বড় ঝাড়ের মধ্যে এক হাজার ৪৮০টি প্রদীপ জ্বালানো হতো। শুধু তিনটি রুপার ঝাড়েই ৩৬ সের তেল পোড়ানো হতো। ৩০০ কর্মচারী ও খাদেম শুধু এই মসজিদের তদারকিতেই নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৮৪ সালে ঐতিহাসিক এ মসজিদটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত দেয়। মসজিদের ভেতরে ঢোকার জন্য টিকিট ফি ১০ ইউরো। প্রতিদিন অনেক পর্যটক ভিড় করেন ঐতিহাসিক এ মসজিদটি দেখার জন্য। হৃদয়গ্রাহী নকশা ও স্থাপত্যশৈলীর জন্য নবম ও দশম শতাব্দীতে এটি ছিল সারা বিশ্বের প্রথম সারির মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মসজিদ থেকে গির্জা

মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আন্দালুসিয়াকে বিভক্ত করে ফেলে। মুসলমানদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্যাসলের রাজা ফার্দিনান্দ ও রানী ইসাবেলা ১২৩৬ সালে স্পেন দখল করলে এই মসজিদকে গির্জায় পরিণত করা হয়। তখন থেকে একে বলা হয় দ্য মস্ক ক্যাথেড্রাল অব কর্ডোভা।

স্থাপনের পর থেকে মুসলিমরা এখানে নামাজ আদায় করেছিল প্রায় পাঁচশ বছর ধরে। এর সুউচ্চ চারকোনা আকৃতির মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন খলিফা তৃতীয় আব্দুর রাহমান। এক সময় সুন্দর সেই মিনার থেকে ভেসে আসত আজানের ধ্বনি। কিন্তু গির্জায় রূপান্তরিত হওয়ার পর মিনারটিতে অসংখ্য ঘণ্টা লাগানো হয়েছে।

মসজিদে ঢুকতেই চোখে পড়বে যিশুর ক্রুশবিদ্ধ মূর্তি। মসজিদের বিভিন্ন আয়াত ও আল্লাহর নামের ক্যালিওগ্রাফির পরিবর্তে এখন শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন তৈলচিত্রের ক্রিশ্চিয়ান ফলক। মসজিদের ভেতরের দেয়ালে ও দেয়াল সংলগ্ন অংশে খ্রিস্টধর্মীয় চিত্র ও ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। বেশ কয়েক জায়গায় আলাদা করে গির্জার মঞ্চ ও পুণ্যার্থীদের বসার বেঞ্চ রয়েছে। মঞ্চে শোভিত হচ্ছে যিশুখ্রিস্ট ও সাধুদের ভাস্কর্য।

বর্তমানে কর্ডোভা মসজিদে জুতা পরিহিত অবস্থায় প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং সেখানে নামাজ আদায় করা এখন নিষিদ্ধ।

আল্লামা ইকবালের নামাজ আদায়

স্পেন থেকে মুসলমানরা বিতাড়িত হওয়ার পর দীর্ঘ ৭০০ বছর কর্ডোভা মসজিদে কোনো আজান ও নামাজ হয়নি। আল্লামা ইকবালের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল এই মসজিদে দু’রাকাত নামাজ পড়া।

১৯৩৩ সালে স্পেন সফরকালে আল্লামা ইকবাল এই মসজিদ পরিদর্শন করেন। মসজিদে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও শুধু আল্লামা ইকবালকে মসজিদে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে, প্রবেশের পর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলা হয়।

মসজিদে প্রবেশ করেই উচ্চস্বরে আজান দেন আল্লামা ইকবাল। দীর্ঘ সাতশ’ বছর পর ওই মসজিদে এটিই ছিল প্রথম আজান। মসজিদের দেয়াল ও স্তম্ভগুলো দীর্ঘকাল পর আজানের ধ্বনি শুনতে পায়। আজানের পর জায়নামাজ বিছিয়ে দু’রাকাত নামাজ আদায় করেন ইকবাল। নামাজে এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, তিনি বেহুঁশ হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে মোনাজাত করেন। মোনাজাতের প্রতিটি বাক্যই কবিতার মতো করে আবৃত্তি করেছিলেন তিনি। তার এই মোনাজাতটিই ‘বালে জিবরিল’ নামে পরিচিত।

কর্ডোভার মসজিদে আল্লামা ইকবালের নামাজ আদায়ের ঘটনা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। অসাধারণ নৈপুণ্যে তৈরি এই মসজিদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মহাকবি আল্লামা ইকবাল রচনা করেছিলেন ৭টি কবিতা।

২০০০ সালের প্রথম দিকে স্প্যানিশ মুসলমানরা এই মসজিদের নামাজ আদায় করার দাবি জানালে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। মুসলিম সভ্যতার অনন্য নিদর্শন এই কর্ডোভা মসজিদটি এখনো গির্জা হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।থিবীর ইতিহাসে স্পেনে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়েছিল মুর জাতির মাধ্যমে। তারা রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছিল কর্ডোভা নগরীকে। ৭১১ থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত মুসলিম শাসনামলে সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায় স্পেন। এ সময় স্পেনে শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটে। নির্মিত হয় অনেক লাইব্রেরি, হাম্মাম (গোসলখানা) ও মসজিদ। অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যে তৈরি অসংখ্য মুসলিম স্থাপনা যে কোনো মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিতে

সক্ষম। এসব স্থাপনার মধ্যে কর্ডোভা মসজিদ অন্যতম। লিখেছেন আন্দালিব আয়ান স্পেনে মুসলিম শাসন

৭১১ সালে স্পেন জয় করার জন্য মুসলিম শাসক মুসা বিন নুসায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন তার সেরা সেনাপতি তাঞ্জিয়ার্সের তৎকালীন গভর্নর তারিক বিন জিয়াদকে। তারিক সদ্য ইসলাম গ্রহণ করা ৭ হাজার সৈন্য নিয়ে পাড়ি জমালেন হিস্প্যানিয়ার উদ্দেশে। এই বাহিনীর সঙ্গে যোগ হয়েছিল মুসা বিন নুসায়েরের আরও ৫ হাজার সৈন্য। তারিকের বাহিনী মূলত মরক্কোর মুর জাতি দ্বারা গঠিত হয়েছিল। তারিক ছিলেন মুসা বিন নুসায়েরের একজন দাস, পরবর্তী সময়ে মুসা তাকে মুক্ত করে সেনাপতি বানান।

৭১১ সালের এপ্রিল ২৬ তারিক বিন জিয়াদ তার বাহিনী নিয়ে জিব্রাল্টারে পা রাখলেন। ক্ষুদ্র এই বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য ভিজিগথ রাজা রডারিক জড়ো করেছিলেন প্রায় এক লাখ সৈন্য। এমন অবস্থায় তারিক আদেশ দিলেন পেছনে থাকা নিজেদের সব জাহাজ পুড়িয়ে দিতে। পরে তিনি তার সৈন্যদের উদ্দেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তারিক বলেছিলেন, ‘হে আমার সৈন্যরা, তোমরা পালাবে কোথায়? তোমাদের পেছনে সাগর, তোমাদের সামনে রয়েছে অগণিত শত্রু। আর জীবন বাঁচানোর জন্য তোমাদের কাছে রয়েছে শুধু তলোয়ার। মনে রেখো এই অসাধারণ যুদ্ধে আমিই সবার সামনে থাকব যা তোমরা করতে যাচ্ছো।’

তারিকের ভাষণ শুনে উজ্জীবিত সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ল রডারিকের বিশাল বাহিনীর ওপর। রডারিকের বাহিনী তখন দ্বিধাবিভক্ত, নিজেদের সুরক্ষিত শহর ছেড়ে এই প্রান্তরে যুদ্ধ করতে এসে যারপরনাই বিরক্ত সামন্ত রাজারা। তাছাড়া এই বিশাল বাহিনী রডারিকের অনুগতও নয়। এই সুযোগটাই কাজে লাগাল মুসলিমরা। অসাধারণ রণকৌশলে মুহূর্তের মধ্যেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল ভিজিগথ বাহিনী। গুয়াদেলেতের যুদ্ধে নিহত হলো রডারিক, হিস্প্যানিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হলো মুসলিম শাসন। এভাবে জিব্রাল্টার থেকে দক্ষিণ ফ্রান্স পর্যন্ত মুসলিমদের দখলে চলে এলো। দশম শতাব্দীর মধ্যেই আল-আন্দালুস পরিণত হলো ইউরোপ, আফ্রিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্র হিসেবে। পণ্ডিতরা চর্চা করতে থাকলেন বিজ্ঞান-দর্শনশাস্ত্রের, থেমে যাওয়া প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞান আবারও আলোর মুখ দেখল তাদের হাত ধরে।

পূর্বের আরব রাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোকে সবদিক থেকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিল আল-আন্দালুস। রোমানদের কাছ থেকে ধার নেওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং আর শহরের পরিকল্পনার সঙ্গে ইসলামি স্থাপত্যকলা মিশিয়ে নতুন করে গড়া হলো আন্দালুসের শহরগুলো। ভ্যালেন্সিয়া আর সেভিল ছিল বর্তমানের দুবাই কিংবা দোহার মতো বিলাসবহুল শহর। শহরে শহরে তৈরি করা হলো হাম্মামখানা, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। নারীরা, বিশেষ করে অভিজাতরা মধ্যযুগীয় খ্রিস্টানদের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করত। এ অবস্থায় ধর্মান্তরিত না হওয়া খ্রিস্টান আর ইহুদিরাও কিছুটা ইসলামি সংস্কৃতিতে প্রভাবান্বিত হয়েছিল। তৎকালীন বেশ কিছু খ্রিস্টান সূত্রমতে, আন্দালুসের খ্রিস্টান যুবকদের অনেকেই আরব কবিদের সাহিত্যকর্ম আয়ত্ত করেছিল, এমনকি কোরআনও মুখস্থ করেছিল।

বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ আর ইহুদি দার্শনিক মাইমোনাইডসের জন্মই হয়েছে আন্দালুসে। ক্লাসিক আরবি আর হিব্রু সাহিত্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় আইবেরীয় লোকগান আর কবিতাগুলো। সেভিল, কর্ডোবা কিংবা গ্রানাডার বাড়িঘরের দেয়ালে এখনো চোখে পড়ে আরবি ক্যালিওগ্রাফি আর জ্যামিতিক নকশাগুলো। জ্ঞান-বিজ্ঞানেও সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল আন্দালুসীয়রা।

জ্ঞানবিজ্ঞানের স্বপ্নপুরী কর্ডোভা

জ্ঞানবিজ্ঞানে কর্ডোভার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। এই নগরীর প্রত্যেক নরপতিই ছিলেন বিদ্যানুরাগী ও জ্ঞানসেবক। জ্ঞানবিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কর্ডোভাই ছিল ইউরোপের পথপ্রদর্শক। প্রখ্যাত মুসলিম ভূগোল বিশারদ ইয়াকুত আল হামাবির মতে, কর্ডোভা ছিল গোটা আন্দালুসের প্রাণকেন্দ্র।

স্পেন মুসলিমদের প্রথম করতলগত হয় মুর জাতির মাধ্যমে। মুসলিমরা বিজিত ভূখ-ের রাজধানী হিসেবে কর্ডোভাকেই বেছে নেয়। শুধু ভূখ-ের দখল নয়, বরং এর সার্বিক উন্নয়নের প্রতি পুরো মনোনিবেশ করেন মুসলিম শাসকরা।

খলিফাদের নিয়োগ করা মোট তেইশ জন প্রশাসক এই ভূখ- শাসন করেছিলেন। তবে ৭১৬ সালে এটি দামেস্কের কেন্দ্রীয় খেলাফতের অধীনে চলে যায়। পরে ৯২৯ থেকে ১০৩১ পর্যন্ত এখানেই একটি স্বতন্ত্র খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময় পরিসরকেই কর্ডোভার ঐশ্বর্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের সোনালি যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।

একাদশ শতাব্দীতে জ্ঞানবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি সর্বক্ষেত্রেই কর্ডোভা হয়ে উঠেছিল গোটা বিশ্বের অগ্রণী নগর। ইউরোপের বহু খ্রিস্টান বিদ্যা অর্জনের জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন এই নগরীতে। তাদের অনেকে পেশাজীবী হিসেবে এই শহরেই বাস করতেন। অনেকে এখান থেকে বিদ্যা আহরণ করে পিরেনিজ পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে চলে যান ইউরোপে। তখন তারাই হয়ে যান অবশিষ্ট ইউরোপের মহাজ্ঞানী। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের শিল্প, সাহিত্য ও সভ্যতায় সেকালের কর্ডোভার প্রভাব পরিদৃষ্ট হয়। নগর সভ্যতার এতটা উৎকর্ষ সে কালের আর কোনো নগরীর ভাগ্যে জোটেনি। সে সময় গোটা কর্ডোভায় পাঁচ শতাধিক লাইব্রেরি ছিল। তৎকালীন ইউরোপে গোসলখানাকে নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হতো, অথচ কর্ডোভাতে ছিল ৯০০ পাবলিক বাথ। দশম শতকে কর্ডোভাতে ছিল ৭০০ মসজিদ।

শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান সাধনায় নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নেও কর্ডোভা ছিল সেকালের রোল মডেল। চামড়া, লোহা, সুতা, রেশম এবং বস্ত্রসহ বহুমুখী উৎপাদনের কেন্দ্রও ছিল এই কর্ডোভা। ইউরোপের বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের কাপড় তৈরি হতো এই ভূখণ্ডেই। কৃষি খাতেও কর্ডোভা ছিল বহু এগিয়ে। সেকালের চাকা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেচ কাজ পরিচালিত হতো। মরুময় আরবের কঠোর পরিশ্রমী জাতি এখানে সোনার ফসল ফলাতে লাগল। নানা ধরনের সবজি ও ফলফলাদি বেশ সহজেই উৎপাদন হচ্ছিল। এসব উৎপাদন কর্ডোভার অর্থনীতিকে বহুদূর এগিয়ে নিয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বায়ুকলের ব্যবহার গোটা ইউরোপের মাঝে এই ভূখণ্ডেই সর্বপ্রথম হয়েছিল।

কর্ডোভা মসজিদের নির্মাণ

খলিফা প্রথম আব্দুর রাহমানের শাসনামলে ৭৮৪ থেকে ৭৮৬ সালে আন্দালুসিয়ার কর্ডোভায় নির্মিত হয় ঐতিহাসিক কর্ডোভা মসজিদটি। পরে অন্যান্য শাসকের মাধ্যমে মসজিদের সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধন ঘটে। স্প্যানিশ ভাষায় মসজিদকে বলা হয় ‘মেজিকেতা’। তাই স্প্যানিশ ভাষায় এই মসজিদ লা মেজিকেতা নামে পরিচিত। কর্ডোভা মসজিদটি মুরিশ স্থাপত্যের সর্বাপেক্ষা নিখুঁত স্তম্ভগুলোর মধ্যে একটি। স্থাপনের পর প্রায় পাঁচশ বছরেরও বেশি সময় এ মসজিদে নামাজ আদায় করেন মুসলমানরা। সে সময় মসজিদটি ইসলামি শিক্ষা, শরিয়া আইন ও সালিশ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তারপর ক্যাসলের রাজা তৃতীয় ফার্দিনান্দ ও রানী ইসাবেলা ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানদের পরাজিত করে স্পেন দখল করলে পাল্টে যায় কাহিনী।

স্থাপত্য কৌশল

১ লাখ ১০ হাজার ৪০০ বর্গফুট আয়তনের মসজিদটির নকশা করেন একজন সিরিয়ান স্থপতি। এর থামের সংখ্যা ৮৫৬টি। এছাড়াও ৯টি বাহির দরজা ও ১১টি অভ্যন্তরীণ দরজা রয়েছে। লাল ডোরাকাটা খিলানগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় স্থাপত্যশিল্পে মুসলিম পা-িত্যের কথা।

অনিন্দ্য সুন্দর এই মসজিদের থামগুলো নির্মিত হয়েছে মার্বেল, গ্রানাইট, জেসপার, অনিক্স পাথর দিয়ে। পরে নতুন করে সংস্কার করে সোনা, রুপা ও তামাসহ অনেক মূল্যবান উপাদান ব্যবহার করে এর সৌন্দর্য আরও বাড়ানো হয়।

কর্ডোভা মসজিদ নির্মাণে সেকালেই আড়াই থেকে তিন লাখ মুদ্রা ব্যয় করা হয়েছিল। পূর্ব-পশ্চিমে এর দৈর্ঘ্য ছিল ৫০০ ফুট। এর সুন্দর ও আকর্ষণীয় মিহরাবগুলো স্থাপিত ছিল পাথরের নির্মিত এক হাজার ৪১৭টি স্তম্ভের ওপর। মিহরাবের কাছে একটি উঁচু মিম্বর ছিল হাতির দাঁত ও ৩৬ হাজার বিভিন্ন রং ও বিভিন্ন কাষ্ঠখ-ের তৈরি। সেগুলোর ওপর ছিল হরেক ধরনের হীরা-জহরতের কারুকাজ। দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রমে মিম্বরটি নির্মাণ করা হয়। তৈরি করা হয় ১০৮ ফুট উঁচু মিনার, যাতে ওঠানামার জন্য নির্মিত দুটি সিঁড়ির ছিল ১০৭টি ধাপ। মসজিদের মধ্যে ছোট-বড় ১০ হাজার ঝাড়বাতি জ্বালানো হতো। তার মধ্যে সর্ববৃহৎ তিনটি ঝাড়বাতি ছিল রুপার, বাকিগুলো পিতলের তৈরি। বড় বড় ঝাড়ের মধ্যে এক হাজার ৪৮০টি প্রদীপ জ্বালানো হতো। শুধু তিনটি রুপার ঝাড়েই ৩৬ সের তেল পোড়ানো হতো। ৩০০ কর্মচারী ও খাদেম শুধু এই মসজিদের তদারকিতেই নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৮৪ সালে ঐতিহাসিক এ মসজিদটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত দেয়। মসজিদের ভেতরে ঢোকার জন্য টিকিট ফি ১০ ইউরো। প্রতিদিন অনেক পর্যটক ভিড় করেন ঐতিহাসিক এ মসজিদটি দেখার জন্য। হৃদয়গ্রাহী নকশা ও স্থাপত্যশৈলীর জন্য নবম ও দশম শতাব্দীতে এটি ছিল সারা বিশ্বের প্রথম সারির মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মসজিদ থেকে গির্জা

মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আন্দালুসিয়াকে বিভক্ত করে ফেলে। মুসলমানদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্যাসলের রাজা ফার্দিনান্দ ও রানী ইসাবেলা ১২৩৬ সালে স্পেন দখল করলে এই মসজিদকে গির্জায় পরিণত করা হয়। তখন থেকে একে বলা হয় দ্য মস্ক ক্যাথেড্রাল অব কর্ডোভা।

স্থাপনের পর থেকে মুসলিমরা এখানে নামাজ আদায় করেছিল প্রায় পাঁচশ বছর ধরে। এর সুউচ্চ চারকোনা আকৃতির মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন খলিফা তৃতীয় আব্দুর রাহমান। এক সময় সুন্দর সেই মিনার থেকে ভেসে আসত আজানের ধ্বনি। কিন্তু গির্জায় রূপান্তরিত হওয়ার পর মিনারটিতে অসংখ্য ঘণ্টা লাগানো হয়েছে।

মসজিদে ঢুকতেই চোখে পড়বে যিশুর ক্রুশবিদ্ধ মূর্তি। মসজিদের বিভিন্ন আয়াত ও আল্লাহর নামের ক্যালিওগ্রাফির পরিবর্তে এখন শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন তৈলচিত্রের ক্রিশ্চিয়ান ফলক। মসজিদের ভেতরের দেয়ালে ও দেয়াল সংলগ্ন অংশে খ্রিস্টধর্মীয় চিত্র ও ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। বেশ কয়েক জায়গায় আলাদা করে গির্জার মঞ্চ ও পুণ্যার্থীদের বসার বেঞ্চ রয়েছে। মঞ্চে শোভিত হচ্ছে যিশুখ্রিস্ট ও সাধুদের ভাস্কর্য।

বর্তমানে কর্ডোভা মসজিদে জুতা পরিহিত অবস্থায় প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং সেখানে নামাজ আদায় করা এখন নিষিদ্ধ।

আল্লামা ইকবালের নামাজ আদায়

স্পেন থেকে মুসলমানরা বিতাড়িত হওয়ার পর দীর্ঘ ৭০০ বছর কর্ডোভা মসজিদে কোনো আজান ও নামাজ হয়নি। আল্লামা ইকবালের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল এই মসজিদে দু’রাকাত নামাজ পড়া।

১৯৩৩ সালে স্পেন সফরকালে আল্লামা ইকবাল এই মসজিদ পরিদর্শন করেন। মসজিদে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও শুধু আল্লামা ইকবালকে মসজিদে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে, প্রবেশের পর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলা হয়।

মসজিদে প্রবেশ করেই উচ্চস্বরে আজান দেন আল্লামা ইকবাল। দীর্ঘ সাতশ’ বছর পর ওই মসজিদে এটিই ছিল প্রথম আজান। মসজিদের দেয়াল ও স্তম্ভগুলো দীর্ঘকাল পর আজানের ধ্বনি শুনতে পায়। আজানের পর জায়নামাজ বিছিয়ে দু’রাকাত নামাজ আদায় করেন ইকবাল। নামাজে এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, তিনি বেহুঁশ হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে মোনাজাত করেন। মোনাজাতের প্রতিটি বাক্যই কবিতার মতো করে আবৃত্তি করেছিলেন তিনি। তার এই মোনাজাতটিই ‘বালে জিবরিল’ নামে পরিচিত।

কর্ডোভার মসজিদে আল্লামা ইকবালের নামাজ আদায়ের ঘটনা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। অসাধারণ নৈপুণ্যে তৈরি এই মসজিদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মহাকবি আল্লামা ইকবাল রচনা করেছিলেন ৭টি কবিতা।

২০০০ সালের প্রথম দিকে স্প্যানিশ মুসলমানরা এই মসজিদের নামাজ আদায় করার দাবি জানালে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। মুসলিম সভ্যতার অনন্য নিদর্শন এই কর্ডোভা মসজিদটি এখনো গির্জা হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ