রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২, ০৮:৩৪ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে অনড় সরকার!

/ ২৮৮ পঠিত
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২০

মুজিববর্ষ উপলক্ষে রাজধানীর দোলাইরপাড়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ থেকে পিছু হটবে না সরকার। হেফাজতে ইসলামসহ কিছু ধর্মভিত্তিক দল যতই বিরোধিতা করুক, এমনকি ভাস্কর্যের বদলে ‘মুজিব মিনার’ নির্মাণের যে প্রস্তাব দিয়েছে হেফাজত, তাও বিবেচনায় নেওয়া হবে না। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এ তথ্য জানিয়েছেন।

অন্যদিকে হেফাজত সূত্র জানিয়েছে, ভাস্কর্য নিয়ে উদ্ভূত সার্বিক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিতে চান কওমি মাদরাসার শীর্ষস্থানীয় আলেমরা। আজ মঙ্গলবার এ সাক্ষাৎ হতে পারে। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চিঠি দিয়ে নিজেদের এ আগ্রহের কথা জানিয়েছেন আল হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) সভাপতি আল্লামা মাহমুদুল হাসান। তিনিসহ পাঁচ থেকে সাতজন বৈঠকে অংশ নিতে পারেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে ভাস্কর্যের বদলে কোরআন-সুন্নাহ সমর্থিত বিকল্প খোঁজার পরামর্শ দিতে চান।
সরকারের একাধিক মন্ত্রী জানিয়েছেন, কওমি আলেমদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করা হয়নি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী দেখছেন। তিনিই সিদ্ধান্ত দেবেন।

জানা গেছে, গত শনিবার কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে একটি বৈঠক করেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সাক্ষাতের সুযোগ পেলে ভাস্কর্য বিষয়ে কোরআন-হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে একটি চিঠি এবং বৈঠকে গৃহীত পাঁচ দফা প্রস্তাবনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হবে। এ ছাড়া বিকল্প সমাধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের পরিবর্তে আল্লাহর নাম খচিত ‘মুজিব মিনার’ নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস গতকাল রাতে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়ে আজই (গতকাল) বেফাকের সভাপতি মাওলানা মাহমুদুল হাসান একটি চিঠি দিয়েছেন।’ কখন এ সাক্ষাৎ হতে পারে, প্রতিনিধিদলে কারা থাকছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাক্ষাতের সময় ও প্রতিনিধিদলে কয়জন থাকতে পারবেন, তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নির্ধারিত হবে।
ভাস্কর্যবিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছেন, এতে সাড়া দেওয়া হবে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সাক্ষাৎ দেবেন কি না সেটি আমি জানি না। আলোচনার সুযোগ আছে কি না, সেটিও প্রধানমন্ত্রী দেখছেন। সব বিষয়েই সরকারপ্রধান যদি মনে করেন তাহলে হতে পারে। তিনি যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই।’ তিনি গতকাল সচিবালয়ে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিকল্প হিসেবে ‘মুজিব মিনার’ নির্মাণে হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামী নেতাদের একটি অংশের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাবের প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ভাস্কর্য নির্মাণকাজ, যেটা নির্মাণাধীন, নির্মাণকাজ চলবে। আমরা ভাস্কর্য নির্মাণ করব। তারা যে প্রস্তাব দিয়েছে, এটি তারা দেখুক, এটি তাদের বিষয়।’

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা, যারা ঘটাবে সেটি তো অবশ্যই সংবিধান ও রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। কারণ বঙ্গবন্ধু তো আমাদের জাতির পিতা সাংবিধানিকভাবে। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপর হামলা যারাই করবে, এ ধৃষ্টতা যারাই দেখাবে, তাদের চরম মূল্য দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এ প্রশ্নে আপস করা যায় না। এটা অযৌক্তিক, অগ্রহণযোগ্য।’

ভাস্কর্য ভাঙচুরে ঘটনায় কাউকে হুকুমের আসামি করা হবে কি না জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা যদি সে রকম প্রমাণ পাই কেউ হুকুম দিয়েছে, সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকে, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার হুমকির বিরুদ্ধে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা সরকারে আছি, ক্ষমতায় আছি, আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় থাকতে হবে। কথায় কথায় মাথা গরম করলে চলবে না, বুঝে-শুনে পরিস্থিতি ট্যাকল করতে হবে। কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে…এখানে আবার আমাদের দেশে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সেনসিটিভ ইস্যু। কাজেই এখানে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বিষয়গুলো দেখছেন এবং এটা ট্যাকল করছেন সেভাবে, আমরা অহেতুক দেশে একটা অশান্তি-বিশৃঙ্খল পরিবেশের উসকানি দিতে চাই না। আমরা যুক্তি দিয়ে বলতে চাই, তারা যা বলছে তা সঠিক না।’

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নীলফামারীতে মানুষ পুড়িয়ে ফেলা ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার মাধ্যমে দেশে মৌলবাদের উত্থান হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, ‘শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে একটা আন্দোলন হয়েছিল, সেটাও তো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, মুসলিম দেশগুলোতে এ বিষয়গুলো থাকে, মাঝেমধ্যে ধর্মীয় ইস্যু চলে আসে—এর পেছনে রাজনৈতিক কারণও আছে। আমরা এটা অবজার্ভ করছি, এখন তো সারা বাংলাদেশে রাজনৈতিক না স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও প্রতিবাদ করছে। আমি মনে করি, কিছু কিছু বিষয় আছে, যেগুলো রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা উচিত।’

হেফাজতের সঙ্গে সরকার ‘সুসম্পর্ক’ গড়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে কারো কারো মন্তব্যের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এ কথাটা মোটেও সঠিক নয়, কারণ তারা ১৪ লাখ কওমি মাদরাসার স্টুডেন্ট আছে, এদের মেইন স্ট্রিমে নিয়ে আসতে তাদের দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। এর মানে এই নয় যে তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক করা হয়েছে। হেফাজত কোনো রাজনৈতিক সংগঠনও নয়, কোনো সমঝোতার বিষয় নেই।’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কওমি নেতাদের সাক্ষাতের বিষয়ে জানতে চাইলে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনো তাদের কারো সঙ্গে আমার কোনো কথা হয় নাই। তারা চিঠি দিতে চাইলে দিবে। এতে তো অসুবিধার কোনো কারণ নাই। ভাস্কর্য ইস্যুতে কোনো মীমাংসার বিষয় নিয়ে তারা যদি চিঠি বা দাবিদাওয়া আমার মন্ত্রণালয়ে দেয়, তাহলে আমরা তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাব। উনি যখন নির্দেশনা দেবেন তখন আমরা এই বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করতে পারব। অবশ্যই তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাতে হবে।’

ভাস্কর্যের পক্ষে ও বিরোধীদের মুখোমুখি অবস্থান প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান বলেন, ‘যেখানে সমস্যা আছে, সেখানে সমাধান হওয়ার সুযোগও থাকে। যদি সমাধান হওয়ার মতো কোনো আবেদন তাঁরা দিতে চান, এটা অবশ্যই আমরা ভালোর চোখে দেখব। আমরা তাঁদের আবেদন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেব। উনি যেভাবে নির্দেশনা দেবেন, আমরা সেভাবেই অগ্রসর হব।’

বেফাকের ৫ দফা প্রস্তাবনার উল্লেখযোগ্য বিষয় :

প্রস্তাবনার প্রথমটিতে আছে, মানবমূর্তি ও ভাস্কর্য ইসলামে নিষিদ্ধ; ফলে কারো প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তার স্মৃতিকে জাগ্রত রাখতে মূর্তি বা ভাস্কর্য নির্মাণ না করে, কোরআন-সুন্নাহ সমর্থিত কোনো উত্তম বিকল্প সন্ধান করাই যুক্তিযুক্ত। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বনবীর প্রতি অবমাননাকর আচরণ বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং দোষীদের ব্যবস্থা নেওয়া; বিগত সময়ে দ্বিনি আন্দোলনে গ্রেপ্তারকৃতদের নিঃশর্ত মুক্তি দান ও মামলা প্রত্যাহার করা; ইসলামী মাহফিলে মাইক ব্যবহারের ভোগান্তি দূর করা এবং আলেমদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব থাকছে পাঁচ দফায়।

*কালেরকণ্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ