রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২, ০৮:২৩ অপরাহ্ন

ছোটগল্প ; বৃষ্টির হাসি!

/ ৫৮৭ পঠিত
প্রকাশের সময় : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০

আনীস বিন সাইফ

সকাল থেকেই আকাশটা থম মেরে আছে। সেই সাথে প্রচণ্ড গরম পড়েছে। আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঝুম একটা বৃষ্টি হবে। মেঘের আনাগোনা দেখছি আর মনে মনে দুআ করছি বৃষ্টিটা যেন জোহরের আগে হয়। বেশ কদিন হয়ে গেলো বৃষ্টিতে ভেজা হয় না।

উত্তর-পশ্চিম কোনায় কালো মেঘ এসে জমা হচ্ছে। দুএক ফোঁটা করে বৃষ্টিও পড়া শুরু হয়েছে।আমি বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছি কখন ধুমসে শুরু হবে।
বৃষ্টির প্রতি আলাদা একটা আকর্ষণ কাজ করে সব সময়। বৃষ্টি শুরু হলে কেমন উদাস হয়ে যাই। অজানা কিছু ভাবনা এসে ভর করে মাথায় । অবচেতন মন কবি হয়ে ওঠে।

বৃষ্টি নিয়ে শব্দে শব্দে মালা গাঁথার চেষ্টা করি। কখনও অতীত চলে আসে বর্তমানে । বৃষ্টির দিনে কী করেছি সব ভাসতে থাকে স্মৃতির আয়নায়। বসে বসে এগুলো ভাবছি। সব ভাবনা ছাপিয়ে কানে এসে বাজলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ার শব্দ । মাটির সোঁদা গন্ধে মন আকুল হয়ে উঠলো। বারোটার কিছু বেশি বাজে। খুব জোরে বৃষ্টি হচ্ছে ।

ভেজার জন্য এরচে উত্তম সময় আর হয় না। ঘর থেকে উঠোনে নেমে এলাম। বৃষ্টির শীতল স্পর্শে দেহমন শিহরিত হয়ে উঠলো। গরম কোথায় যেন পালিয়ে গেলো!!

বাড়ির পাশে আম বাগান। কাউকে কিছু না বলেই সেখানে চলে গেলাম। আম পাকা শুরু হয়েছে বেশ কিছু দিন হলো। এখনও পুরো বাগানের আম সংগ্রহ করা হয়নি। ঝড়েই তো কত আম ঝরিয়ে দিলো পাকার মতো হওয়ার আগেই । বাগানের একপাশে কিছু জায়গা খালি। সবুজ ঘাসে ঢাকা জায়গাটা খুব সুন্দর লাগছে! সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম।

ওপরে খোলা আকাশ। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সরাসরি গায়ে এসে পড়ছে । দুহাত প্রসারিত করে আকাশের দিকে তাকালাম ।বৃষ্টির ফোঁটা চোখে এসে পড়ে। চোখ ছোট করা ছাড়া আকাশ দেখা যায় না । তাই চোখ ছোট করেই দেখছি। আকাশ আগের চেয়ে পরিষ্কার। মনে হলো আকাশ কেঁদে কেটে হালকা হচ্ছে। জমানো দুঃখ-কষ্টগুলো বৃষ্টি আকারে পৃথিবীতে এসে পড়ছে। মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

এই এক সমস্যা! ভালো মন হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে যায়। বিশেষকরে যখন করও মন খারাপের কথা মনে পড়ে। পাত্তা দিলাম না। চোখ বন্ধ করে হাত বুকে বেঁধে চেহারাটা আকাশের দিকে দিয়ে দাঁড়ালাম। চোখেমুখে বৃষ্টির অবিরত ফোঁটা সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছে ।মনে হলো বৃষ্টিকে খুব কাছ থেকে অনুভব করার এই একটা সুযোগ! আমার সমস্ত মনোযোগ এখন বৃষ্টিকে ঘিরে। প্রতিটি ফোঁটার স্পর্শ আলাদাভাবে উপলব্ধি করতে পারছি! মনে হচ্ছে, আমি ভিন্ন কোন জগতে আছি ।

সেখানে বৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই নেই। হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠলো বৃষ্টিভেজা পথ। সেই পথ ধরে আমি ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছি। মাঝারি ধরনের বৃষ্টি আমাকে ভিজিয়ে আনন্দ পাচ্ছে। জনমানবহীন বিরান পথ। কোথাও কেউ নেই । নেই কোন শব্দ বা কোলাহল । কেবল কানে বাজছে গাছের পাতায় পড়া বৃষ্টিকণার রিমঝিম সুর। হঠাৎ খিলখিল হাসির শব্দে চমকিত হলাম।

মনে হলো অনেক দূর থেকে ভেসে এসেছে কোন মেঘপরির হাসি। কিন্তু আমার সমস্ত মনোযোগ ভেঙে খান খান হয়ে গেলো যখন আবার শুনলাম সেই মন পাগল করা হাসি । ধ্যান ভেঙে গেল, চোখ খুলে দেখি ছাতার আড়াল নিয়ে দুজন মানবী হেঁটে যাচ্ছে । আমি অপলক ছাতার দিকে চেয়ে আছি।

আমার পাশ দিয়েই তারা অতিক্রম করেছে। গায়ে পাতলা সাদা গেঞ্জি। ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। আমাকে এই অবস্থায় দেখে তারা হেসেছে। হয়ত পাগলও মনে করেছে। তাদের হাসি শুনেও আমার ধ্যান ভাঙেনি এজন্য আফসোস করবো কিনা বুঝতে পারছি না। কিন্তু হাসির আওয়াজ তো মনে হলো একজনের ।

তবে.. আর চিন্তা করতে পারলাম না। একটি ছাতা ঘুরে গেছে। আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। চেহারায় দৃষ্টি পড়তেই চোখ নামিয়ে নিয়েছি। কিন্তু এখন কী করবো! একচুলও যে নড়তে পারছি না ।কে যেন পা দুটো জমিনের সাথে আটকে দিয়েছে! হৃদপিণ্ডের ওঠানামা বেড়ে গেছে ।

সেই শব্দ নিজ কানে শুনতে পাচ্ছি। অজানা এক ভয়ে আমার পুরো শরীর আড়ষ্ট। সে সামনে এসে দাঁড়ালো। তার ছাতা আমার মাথায় ধরে হেসে দিলো। এই হাসিকে আমি কোন কিছুর সাথেই তুলনা করতে পারবো না । হাসির ঝঙ্কার শেষ না হতেই বলে উঠলো, আমি বৃষ্টি! এভাবে দাঁড়িয়ে ভিজছেন কেন? ঠান্ডা লাগবে না? আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না । শুধু একবার মাথা উঠিয়েছিলাম। তার পরের কথাগুলো আমার মাথায়ই ঢোকেনি। কারণ, পুরো মাথা জুড়েই তখন বৃষ্টি আর বৃষ্টির হাসি!


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ