শিরোনাম
মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ০৯:০৭ অপরাহ্ন

ক্রুসেডারদের কুদস দখল ও মুসলমানদের বাইতুল মাকদিস বিজয় : বিভীষিকা এবং মহানুভবতা

/ ৪২৯ পঠিত
প্রকাশের সময় : বুধবার, ২০ মে, ২০২০


তারিক মুজিব

বাইতুল মাকদিস মুসলমানরা বিজয় করবেন সে ভবিষ্যদ্বাণী রাসূলই করে গিয়েছিলেন। উমর রাযি.-এর খেলাফতকালে সে ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণতা পেলো।

মুসলমানদের একাংশের সেনাপতি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর বিজয়াভিযান দামেশক অবধি পৌঁছে গেল। বাইতুল মাকদিস অবরোধ করে তিনি দুর্গবাসীদের সন্ধির প্রস্তাব পাঠালেন। দুর্গবাসী সন্ধির জন্য প্রস্তাব জুড়ে দিল-আমিরুল মু’মিনীনের আসতে হবে।

খলিফা উমর রাযি. নেতৃস্থানীয় সাহাবীদের পরামর্শ নিয়ে ফিলিস্তিন অভিমুখে রওয়ানা হলেন। যথারীতি খ্রিস্টানদের সাথে সন্ধি স্থাপিত হলো। তাদেরকে শহর ছেড়ে যাওয়ার জন্য তিনদিন সময় দেওয়া হলো। এসময় না হলো কোনো রক্তপাত না হলো বড় কোনো সংঘাত।

তারপর থেকে কুদসের দখল মুসলমানদের হাতেই ছিল দীর্ঘদিন। বাগদাদ বা দামেশক কেন্দ্রীয় খেলাফত যেখানেই ছিল, আব্বাসীয় বা উমাইয়া খলিফা যে বংশেরই ছিলেন কুদসের প্রতি সবার ছিল সজাগ দৃষ্টি। কেননা স্বয়ং রব এই শহরকে বরকতময় নগরী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

একসময় মুসলিম শাসকদের মাঝে দেখা দিল দুনিয়ার লোভ। তারা মত্ত হয়ে গেল মদ ও নারীতে। অপরদিকে খ্রিস্টানদের মাঝে রাজ্য হারানোর ক্ষোভ। খ্রিস্টান ইউরোপ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামের উপর ক্ষুব্ধ ছিল। মুসলিম শাসকদের দুর্বলতার সুযোগ তারা কিছুতেই হাতছাড়া করল না।

১০৯৯ সাল। আশেপাশের অঞ্চল পদানত করে বাইতুল মাকদিসও নিজেদের দখলে নিয়ে নিল। মুসলমানদের ছিল সেদিন শুধু কান্নার দিন। এমন কোনো কেন্দ্রীয় শক্তি তখন মুসলমানদের ছিল না যে খুনের নেশায় মত্ত ক্রুসেডারদের প্রতিরোধ করতে পারে।

বর্বর ক্রুসেডাররা পবিত্র ভূমি জয় করে নিষ্টুরতার চূড়ান্ত করল। বহু নবীর জন্মভূমি কুদস সেদিন দেখেছিল পাশবিকতার চরম পরাকাষ্ঠা।

বিখ্যাত ইংরেজ ঐতিহাসিক লেনপুল তার ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ ভাষায় সে ঘটনার চিত্রায়ন এভাবে করেছে-

“বাইতুল মাকদিসে বিজয়ীবেশে প্রবেশ করার সময় ক্রুসেড যুদ্ধরা এমনভাবে পাইকারী হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল যে, যেসব যোদ্ধা ঘোড়ায় চড়ে মসজিদে উমরে গিয়েছিল তাদের ঘোড়ার হাঁটু পর্যন্ত রক্তের বন্যায় ডুবে গিয়েছিল। শিশুদেরকে সামনে পেলে দেয়ালে আছড়ে মেরে হয় অথবা প্রাচীরের ওপার থেকে চক্রাকারে ঘুরিয়ে বাইরে নিক্ষেপ করা হয়”।

এ ঘটনা অন্য ঐতিহাসিকদের যবানিতে আরও বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।

বাইতুল মাকদিস বে দখল হওয়ার পর থেকে মুসলিমদের রোনাজারি ছিল কবে আবার পবিত্র ভূমির দখল ফিরে পাওয়া যাবে! পবিত্র যমিনে মাথা ঠুকে আর কোনো দিন কি মুসলমানরা রবের কাছে করতে পারবে না কোনো মোনাজাত! মুসলমানরা নতুন কোনো উমরের প্রতীক্ষায় ছিলেন দীর্ঘ ৯০ বছর।

দীর্ঘ ৯০ বছর পর আবির্ভাব হল নতুন উমরের। তিনি নূরুদ্দীন যিনকীর মনোনীত সুলতান সালাহুদ্দীন। আইয়ুবী নামেই পরিচিত তিনি। ৫৮৩ হিজরির ২৭ রজব তিনিই দ্বিতীয় বারের মতো ক্রুসেডারদের থেকে দখলমুক্ত করেন পবিত্র ভূমি। আল্লাহর দুষমনদের অপরিচ্ছন্ন করে ফেলা পাক যমিনকে নিজ হাতে ধুঁয়ে পরিস্কার করেন। অবসান হল মুসলমানদের দীর্ঘ ৯০ বছরের প্রতীক্ষার। বাইতুল মাকদিসের ভূমিতে মাথা ঠুকে মুসলমানরা আবার পাঠ করতে লাগলেন- ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আলা’।

হিত্তিনের চূড়ান্ত যুদ্ধে অনেক ক্রুসেড সৈন্য নিহত হয়। ঐতিহাসিক লেনপুলেরর ভাষ্যানুযায়ী ক্রুসেডারদের মৃতদেহ স্তুপাকার পাথরের মতো পড়ে ছিলো। এর পরেও যারা জীবিত ছিল তারা ছিল ভয়ে কম্পমান। চর্চিত প্রথা অনুযায়ী তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বিভীষিকাময় কোনোকিছু। কিন্তু এদিনেও হল মক্কা বিজয়ের পুনঃচিত্রায়ন। সকলকেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্রুসেডারদের শহর ত্যাগ করতে বলা হল।

সুলতান সালাহুদ্দীন রহ. প্রদর্শিত সেসময়কার সদাশয়তা এবং উদারতার কথা উল্লেখ করে ঐতিহাসিক স্ট্যানলি লোখেন

“সুলতান সালাহুদ্দীনের সমস্ত গুণের ভেতর কেবল এই একটি গুণের কথা যদি দুনিয়া জানত, তিনি কীভাবে জেরুসালেম অনুগৃহীত করেছিলেন তাহলে তারা একবাক্যে স্বীকার করত যে, সুলতান সালাহুদ্দীন কেবল তাঁর যুগের নন বরং সর্বযুগের সর্বাপেক্ষা উন্নত মনোবলসম্পন্ন হৃদয়বান মানুষ এবং বীরত্ব ও ঔদার্যের প্রতীক।

দ্বিতীয়বার বাইতুল মাকদিস বিজয় সম্পর্কে বিখ্যাত মুজাহিদ বাহাউদ্দীন ইবনে শাদ্দাদ বলেন, এ ছিল এক মহান বিজয়। এই পবিত্র মুহূর্তে বায়তুল মাককদিসে আলেম-ওলামা কামিল-ফাজিল মুফাসসির, পর্যটকদের সমাবেশ ঘটে। লোকেরা যখন জানতে পারল যে সমুদ্রোপকূলবর্তী এলাকা সমূহ মুসলমানরা জয় করে ফেলেছে মিশর ও সিরিয়া থেকে ওলামায়ে কেরাম দলে দলে বাইতুল মাকদিস রওয়ানা হন। চতুর্দিকে দোআ, তাকবীর, তাহলীল ধ্বনিত হচ্ছিল।

“৯০ বছর পর বাইতুল মাকদিসে জুমার সালাত অনুষ্ঠিত হয়। কুব্বাতুস সাখরায় ক্রুসেডাররা ক্রুশের যে কাষ্ঠখণ্ড স্থাপন করেছিল তা সরিয়ে সেখানে ইসলামের বিজয় কেতন ওড়ানো হয়। সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। আল্লাহর সাহায্য খোলা চোখেই দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ