রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২, ০৮:২৮ অপরাহ্ন

রমযানের গুরুত্ব ও ফজিলত : আমাদের শৈথিল্য

/ ৪৬৬ পঠিত
প্রকাশের সময় : রবিবার, ১০ মে, ২০২০


হুসাইন আহমাদ খান

রমযান- রহমত মাগফিরাত ও নাজাতের চাদরে আবৃত একটি মাস। রমযানের প্রথম দশকে বান্দার উপর আল্লাহ তাআলার অবারিত রহমতের অবিরাম বারিধারা বর্ষিত হয় । দ্বিতীয় দশকে বান্দার জন্য হয় ক্ষমার ঘোষণা । আর শেষ দশকে বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হয় নাজাতের ফায়সালা। বান্দা একই মাসে এই তিনটি মহানিয়ামত লাভে সৌভাগ্যশীল হতে পারে। এজন্য প্রতিটি মুমীন বান্দার জন্য মাহে রমযানের গুরুত্ব অপরিসীম।

দুই
মাহে রমযানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো, রোযা রাখা। বোধসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম প্রত্যেক নর-নারীর উপর রমযানের রোযা রাখা ফরজ, অপরিহার্য। এতে শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই। পাশাপাশি রোযা ও রোযাদারের জন্য রয়েছে বহু ফজিলত ও পুরস্কারের সুসংবাদ। রোযার পুরস্কার সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে- আল্লাহ তাআলা বলেন,
নিশ্চয়ই রোযা আমার জন্য।

আর এর প্রতিদান স্বয়ং আমিই দিবো। -সহীহ মুসলিম
অপর এক হাদীসে রোযাদারের গুনাহ মাফের সুসংবাদ দিয়ে ইরশাদ হয়েছে- “যে ব্যক্তি পূর্ণ বিশ্বাস সহকারে সওয়াবের উদ্দেশ্যে রমযানের রোযা রাখে, তার জীবনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” -সহীহ বুখারী

রোযা রাখার এই ফজিলতের বিপরীতে রোযা না রাখার গুনাহও মারাত্মক। শরয়ী ওযর ব্যতীত কারো জন্য রোযা তরক করা জায়েয নেই। উপরন্তু রমযানের একটি রোযা ছেড়ে দেওয়ার ক্ষতিপূরণও অসম্ভব। রমযানের এই বরকতপূর্ণ ক্ষণে একটি রোযা তরক করা- পরবর্তীতে সারাজীবন রোযা রাখারও তার সমতুল্য হবে না!


হাদীস শরীফে এসেছে- “যে ব্যক্তি কোনো ওযর বা অসুস্থতা ব্যতিরেকে রমযানের একটি রোযা পরিত্যাগ করবে, সে যদি ঐ রোযার পরিবর্তে আজীবন রোযা রাখে তবুও ঐ একটি রোযার ক্ষতিপূরণ হবে না”। -জামে তিরমিজী
তাই আমাদের জন্য অপরিহার্য ও আবশ্যক হলো, শরয়ী ওযর ব্যতিরেকে রোযা পরিত্যাগ না করা।

তিন
রোযা ও রমযানের এই গুরুত্ব ও ফজিলতের দাবিই হলো, প্রতিটি মুমিন-মুসলমান এ মাসে বেশি থেকে বেশি নেক আমল করবে। মহান আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে অতীতগুনাহ ক্ষমা করিয়ে নেবে এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে নাজাত লাভকারীদের খাতায় নাম লেখাবে। কেননা এ মাসে রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হয় এবং ইফতারের মুহূর্তে অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

যেমন হাদীস শরীফে এসেছে- “যখন রমযান মাস আসে তখন রহমতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়”। -সহীহ মুসলিম
অপর আরেকটি হাদীসের ভাষ্য হলো-
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ইফতারের সময় অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন”। -মুসনাদে আহমাদ। অপরদিকে যে ব্যক্তি রমযান মাস পেয়েও তার গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারলো না তার জন্য আল্লাহ্‌র হুকুমে হযরত জীবরীল আ. বদদুয়া করেছেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে আমীন বলেছেন! (আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই অভিশাপ থেকে রক্ষা করুন, আমীন।)


পবিত্র রমযানের এতো গুরুত্ব ও ফজিলত থাকা সত্ত্বেও এক্ষেত্রে আমাদের অবহেলা অমনযোগীতার অন্ত নেই। মনে হয়, রমযানের ফজিলতের বিরুদ্ধে পাল্লা দিয়ে আমরা গাফিলতি ও উদাসীনতা প্রদর্শন করি। যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজের কথাই ধরুন। রমযানে নামাযের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা হলো, ফজর কেটে যায় সাহরী খাওয়া এবং তারপর বিশ্রামের মধ্য দিয়ে।

জোহর অতিবাহিত হয় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। আছর কাটে ইফতারের বাজার ও ইফতারি প্রস্তুত করতে করতে। মাগরীবের ওয়াক্ত ইফতারি খেতে খেতেই শেষ হয়ে যায়। আর এশা চলে যায় সারাদিনের ক্লান্তির পর ঘুমানোর মধ্য দিয়ে। আমাদের অধিকাংশের অবস্থাই কম-বেশি এমনই। এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় এবং হতাশাজনক!


চার
রমযান কুরআনের মাস। এমাসেই কুরআন অবতরণের সূচনা।এ মাসে কুরআন তিলাওয়াতের রয়েছে বিরাট ফজিলত। তাই আমাদের উচিত অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করা। উপরন্তু সচেতন অভিভাবকগণের করনীয় হলো, রমযানের এই দীর্ঘ ছুটিতে নিজ নিজ সন্তানদের জন্য কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করা।


কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এক্ষেত্রেও আমাদের শৈথিল্য ব্যাপক। আমরা নিজেরাও কুরআন তেলাওয়াতে অমনযোগী এবং সন্তানদেরও কুরআন শিক্ষা দানে অবহেলা করি। ফলে নিজেরাও বিরাট সওয়াব থেকে বঞ্চিত হই এবং সন্তানদেরকেও কুরআনের আলো থেকে মাহরূম করি। একজন মুমীন-মুসলমানের জন্য এমন কাজ উচিত তো নয়-ই বরং অকল্যাণকর ও লজ্জাজনক।

পাঁচ
মাহে রমযানে শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে। এই সুযোগে অধিক পরিমাণে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য হাসিল করা যায়। তাই এমাসে বেশি বেশি যিকির-আযকার, দুআ-দুরূদ ও নফল নামাজ আদায় করা উচিত। এছাড়াও মাহে রমযানে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত রয়েছে, যা অন্য মাসের তুলনায় এ মাসে আদায় করা খুবই সহজ। তন্মধ্যে একটি হলো তাহাজ্জুদের নামাজ। সাহরী খেতে উঠার সময় খুব সহজেই -ইচ্ছা করলে- আমরা দু’চার রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে নিতে পারি। এটা কঠিন কোনো বিষয় নয়।


আরেকটি হলো, রমযানের শেষ দশকে ই’তিকাফ। এটা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। এটাও আমরা খুব সহজেই আদায় করতে পারি- প্রয়োজন শুধু দৃঢ় ইচ্ছা আর একটু চেষ্টা।


কিন্তু বড়ই বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আজ যেন মুসলমানের মাঝে সেই দৃঢ়তা ও চেষ্টার ব্যাপকতা নেই! সব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে!! কিন্তু আমাদেরকে এই উদাসীনতা ও অমনোযোগীতা কাটিয়ে উঠতে হবে। কেননা এটা কোনো মুমীনের গুণ হতে পারে না। মুমীন তো হলেন, আল্লাহর ইবাদতে সর্বদা দৃঢ়পদ ও অটল এবং সকল উদাসীনতাকে নির্মূলকারী।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই গাফিলতি ও অমনোযোগীতা থেকে রক্ষা করুন এবং ঈমান ও আমলে দৃঢ় রাখুন। আমীন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ