রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২, ০৯:৩৫ অপরাহ্ন

ইসলামী অর্থনীতি : পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য

/ ৮৫৪ পঠিত
প্রকাশের সময় : রবিবার, ১০ মে, ২০২০


হুসাইন আহমাদ খান

বর্তমান যুগে অর্থনৈতিক শক্তি একটি বিশ্ব নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক শক্তিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে বৈশ্বিক রাজনীতি। উন্নতি অবনতির মাপকাঠি ধরা হচ্ছে অর্থনৈতিক শক্তিকে। যার ফলে প্রতিতি দেশ- সম্পদ উপার্জনের অঘোষিত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। প্রতিটি মানুষের মাঝে কাজ করছে সম্পদশালী হওয়ার অন্তহীন আকাঙ্ক্ষা। ফলে মানুষ সম্পদের পেছনে পড়ে বিসর্জন দিচ্ছে নিজের নৈতিক মূল্যবোধ।

লিপ্ত হচ্ছে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে।সম্পদের পিছনে ছুটে চলেছে লাগামহীনভাবে।
আধুনিক অর্থনীতিগুলো মানুষের এই লাগামহীনতাকে উস্কে দিচ্ছে আরো বহুগুণে। যার অনিবার্য ফলস্বরূপ মানুষের মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে ধনী-দরিদ্রের আকাশ-পাতাল বৈষম্য। ধনীরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে আর দরিদ্ররা ক্ষুধার যন্ত্রণায় ধুকছে। পুঁজিপতিরা নিজেদের সম্পদ পুঞ্জিভূত করে রাখছে আর গরীবরা দিনাতিপাত করছে অনাহারে অর্ধাহারে।


মানুষের মধ্যকার এ বৈষম্যতা দূর করতে এবং তাদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন সর্বদিক থেকে ভারসাম্যপূর্ণ এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থাগুলো মানুষকে সম্পদশালী করার পাশাপাশি মানুষের মাঝে সুস্থ চিন্তা জাগ্রহ করবে এবং ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূর করতে সক্ষম হবে।

আর এ প্রয়োজন পূরণ করতে পারে একমাত্র ইসলামী অর্থব্যবস্থা। কারণ ইসলামী অর্থনীতিতে যেমন সম্পদ পুঞ্জিভূত হওয়ার সু্যোগ নেই, যার অনিবার্য পরিণতি হলো ধনী দরদ্র বৈষম্য আবার সম্পদ আহরণের বল্গাহীন স্বাধীনতাও নেই, যা মানুষকে নৈতিক অবক্ষয়ের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। বস্তুত ইসলামী অর্থনীতি এমন এক সুষম অর্থনীতি, যা একদিকে মানুষকে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্তি দেয় অপরদিকে সম্পদশালী হতেও বাধা দেয় না।

ইসলামী অর্থনীতির পরিচয়:
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলামের বিধি-বিধান মানবজীবনের প্রতিটি শাখায় বিস্তৃত। যার মধ্যে অর্থনীতিও অন্তর্ভুক্ত। মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আরোপিত বিধি-বিধানের সামষ্টিক রূপ হলো ইসলামী অর্থনীতি।


ইসলামী অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে উদ্ভাবিত বিধি-বিধান তথা ইসলামী শরিয়ত। এ হিসেবে ইসলামী অর্থনীতির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এভাবে দেয়া যায়- ইসলামী শরিয়ত মুতাবেক যে অর্থব্যবস্থা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়,তাকে ইসলামী অর্থনীতি (Islamic Economics) বলে।

বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োজনীয়তা :
ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন সবধরণের প্রান্তিকতা মুক্ত এবং ইসলামী অর্থনীতি একটি পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থা। এতে এমন কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট রয়েছে,যা অন্যান্য অর্থব্যবস্থায় অনুপস্থিত। নিম্নে সেগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হলো-


১. ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক পরিচালিত: ইসলামী অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট হলো,এটি ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রত হয়। ইসলামী অর্থনীতি মানব রচিত কোন অর্থব্যবস্থা নয়। পবিত্র কুরআন সুন্নাহই এর মূল উৎস।


২. সম্পদের মালিকানা: ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট হলো, যাবতীয় সম্পদের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। সুতরাং মানুষ কেবল আল্লাহ তা’আলার প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর আদেশ নিষেধ মোতাবেক এসব সম্পদ ভোগ, দখল ও রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। ফলে ইসলামী অর্থনীতিতে কোন ব্যক্তির ইচ্ছামত সম্পদ ব্যয় ও পুঞ্জিভূত করে রাখার সুযোগ নেই। যাতে করে খুব সহজেই সমাজ থেকে ধনী দরিদ্র বৈষম্য দূরিভূত হতে পারে।


৩. হালাল উপার্জন: ইসলামী অর্থনীতি হালাল পন্থায় সম্পদ উপার্জনের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করে থাকে। ইসলামী অর্থনীতি মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর হালাল হারামের চিরস্থায়ী কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যা সর্বযুগে সর্বস্থানে প্রযোজ্য।

যেমন,সুদ জুয়া হুন্ডি মজুদদারি গুদামজাতকরণ এবং অন্যান্য সকল নিষিদ্ধ ব্যবসা।কারণ এসব কর্মকাণ্ড সাধারণত একচেটিয়া ইজারাদারি প্রতিষ্টার মাধ্যম হয় এবং অর্থনীতিতেও বৈষম্য সৃষ্টি করে। এছাড়া ইসলাম এমন সব পণ্যের উৎপাদন এবং ক্রয় বিক্রয় হারাম সাব্যস্ত করেছে,যার দ্বারা সমাজ কোন অনৈতিকতার শিকার হয় এবং মানুষের নিচু প্রবৃত্তিকে উসকে দিয়ে অবৈধ পন্থায় মুনাফা অর্জনের পথ সৃষ্টি হয়।


৪. সম্পদ বণ্টন: ইসলামী অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টনের মূল লক্ষ্য হলো ন্যায়নীতি ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্টা। সমাজের সর্বস্তরে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করা। যাকাত,সদকা,ফিতরা,উশর,মিরাসী আইন ইত্যাদীর মাধ্যমে ইসলামী অর্থনীতি এ কার্য সম্পাদন করে থাকে।


৫.সুদমুক্ত অর্থনীতি: ইসলাম সুদকে চিরস্থায়ী হারাম সাব্যস্ত করেছে। কারণ সুদ মূলত গরীবদের অভাব ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদেরকে পথে বসানোর ঘৃণিত প্রক্রিয়া। এর দ্বারা ধনীর ধনভাণ্ডার সমৃদ্ধ আর গরীবরা সহায় সম্বলহীন হয়ে পথে বসতে বাধ্য হয়। গরীবের প্রতি এই শোষণ ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। সুদমুক্ত অর্থনীতি ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট।


৬.বাইতুল মাল: ইসলামী অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা সরকারী তহবীলকে বাইতুল মাল বলে। রাষ্ট্রের সমস্ত আয় বাইতুল মালে জমা করা হয়। এবং সরকার তা থেকে প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করে থাকেন। জনগনের মৌলিক চাহাদা পূরণ এবং অভাব দূর করার মহান দায়ীত্ব পালন করে বাইতুল মাল।


৭.সুদবিহীন ব্যাংকিং: সুদবিহীন ব্যাংকিং ইসলামী অর্থনীতির একক বৈশিষ্ট্য। অন্য সকল অর্থনীতিতে এই বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত। বরং অন্য সকল অর্থনীতির মূল ভিত্তিই হলো এই সুদ। ফলে মানুষের মনে এই ধার জন্মেছে যে, সুদ ছাড়া ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড অসম্ভব। মানুষের এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করেছে ইসলামী অর্থনীতি। ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থায় যাবতীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম সুদমুক্ত সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত পন্থায় পরিচালিত হয়।

মোদ্দাকথা,আজকের এ অশান্ত পৃথিবীতে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে, মানুষের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা চালু করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধনে ইসলামী অর্থনীতর বিকল্প নেই। আল্লাহ তা’ আলা আমাদেরকে এই সত্য উপলব্ধি করার এবং পৃথিবীতে এই ব্যবস্থা চালু করার তাওফিক দান করুন। আমীন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ