রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ০২:৪২ অপরাহ্ন

এক রাতে সাদা কাপড়ওয়ালার সাথে

/ ৩৮৪ পঠিত
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২০

     

সাঈদ বিন ইদ্রিস

ছোট বেলার একটি গল্প। তখন আমার বয়স সবেমাত্র সাত বা আট হয়েছে।  সে সময়ের কোন স্মৃতি আমার মনে নেই। কিন্তু কিছু স্মৃতি এমন,যা কখনো ভুলে যাবার মত নয়। ইচ্ছা করলেও ভুলা সম্ভব নয়। ছোট বেলায় একটি  অভ্যাস ছিল বিকেল বেলা।বাজারে যাওয়া।

কিন্তু বাড়ী ফিরতে কখনো রাত হওয়া যাবে না। সন্ধ্যা নেমে আসার। আগেই বাড়ি ফিরা অবশ্যই চাই।এমনিতেও আমি একটু ভীতু টাইপের। ভূতের নাম শুনলেই
গা ছমছম করে উঠে। পুরো দেহ যেন হিমশীতল হয়ে যায়। তাই সন্ধ্যার পর একা একা বাড়ির বাহিরে কেন, রীতিমত ঘর থেকে বের হতেও গলা শুকিয়ে কাঠ হবার উপক্রম।

মূল গল্পে যাবার আগে আমাদের বাড়ির সিস্টেম এবং বাড়িটা কীভাবে সাজানো তার কিছুটা পাঠকদের জানানো দরকার। কারণ গল্পটা আমাদের বাড়ির সামনেই ঘটেছিল।

আমাদের বাড়িটা রাস্তার পাশে একেবারে রাস্তার কোল ঘেঁষে।রাস্তার পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে চলে গেছে। বাড়িটা রাস্তার দক্ষিণ পাশে। রাস্তার সাথে কিছু
জায়গা যা খালি পড়ে আছে।তারপর একটি ঘর দক্ষিণমুখী।এর পশ্চিম পাশে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা আরেকটি ঘর।দুই ঘরের মাঝ দিয়ে মূল বাড়িতে প্রবেশ করতে হয়। বাড়ির একদম দক্ষিণ পাশে রয়েছে ওয়াশ রুম। রাস্তার পাশে আরো রয়েছে বিশাল এক তেঁতুল গাছ । এটি এখন যৌবন পেরিয়ে বৃদ্ধ হতে শুরু করেছে।

এবার মূল গল্পে যাওয়া যাক। সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল। প্রচন্ড গরমে যেন হাহাকার করছে চারদিক। মানুষজন এমনকি গৃহপালিত পশু-পাখি এবং হিংস্র জানোওয়ারগুলোও যেন মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে যাবার উপক্রম। দিনটি ছিল বুধবার। বাজার থেকে আসতে গিয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে বাজারেই। সূর্যি মামা হারিয়ে গেছে পশ্চিমাকাশে। আস্তে আস্তে চারদিকে নেমে  অন্ধকার। নিকষ কালো অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।গোটা বিশ্বময়। যতই চারদিক ছেয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে,ততই মনের মাঝে এক প্রকার। ভীতি বাসা বাঁধতে শুরু করেছে।

কিন্তু কোন এক কারণে ফিরতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। যতই দেরি হচ্ছে,ততই ভয় বেড়ে চলছে। যদিও বাজার থেকে আমাদের বাড়ি খুব দূর নয়। বরং খুবই কাছে। তবে আগেই বলেছি, ভূতের ভয়ে আমি রাতে ঘর থেকেও বের হই না। পথ খুব সামন্য হলেও এর মাঝে রয়েছে বিশাল এক বাঁশ ঝাড়, যা পেরিয়ে আমাকে আসতে হবে। তারপর রয়েছে ঐতিহাসিক। সেই তেঁতুল গাছ। এগুলোই হল যতসব সমস্যার।গোড়া।

রাত যখন কিছুটা প্রখর হয়েছে এবং তার ছায়া সর্বত্র বিস্তার করেছে তখন আমি বাজার থেকে রওনা হয়েছি বাড়ীর উদ্দেশ্যে। মিনিট দশেক লাগবে বাড়ি আসতে। আর আমি যেহেতু একা এবং ছোট তাতে আরও কিছু সময় বেশি লাগবে।পথ চলছি আর চারপাশ থেকে ভয় যেন আমাকে খাবলে ধরার চেষ্টায় মেতে ওঠেছে। সবাই যেন আমার উপর বিজয়ী হতে খুব চেষ্টা করছে। 

বাজার থেকে বের হয়ে সোজা পূর্ব দিকে সামন্য পথ পেরুলেই সেই বাঁশ ঝাড়।সেখান থেকে পথটা ডান দিকে মোড় নিয়েছে বাঁশ ঝাড়ের কোল ঘেঁষে। যেই
বাঁশ ঝাড়ের খুব নিকটে চলে এসেছি তখনই আমার পুরো দেহ যেন একদম ঠান্ডা হয়ে গেল। সামনে ঝাড় আর সেটার পাশ দিয়েই আমাকে আসতে হবে।পা যেন চলতে চাইছে না। অজানা এক শক্তি আমার পা দু’টো শক্ত ধরে রাখতে চাইছে।কোথাও কোন শব্দ নেই। যেন সব আওয়াজ থেমে গেছে  সাথে। আমি পথ।চলছি। আমাকে যে বাড়ি পৌঁছাতেই হবে।আস্তে। আস্তে এগুতে থাকি। এই তো পথ কমে আসছে।

ঐ তো বাড়ি দেখক যাচ্ছে। তবে মূল ঘটনাটা ঘটেছে আরো পরে। আস্তে আস্তে যখন বাড়ির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি তখনই ঘটে গেল এবং আচমকা জ্ঞাণ।হারিয়ে ফেলার উপক্রম হলাম।

কিন্তু না, এখনো আমার জ্ঞান রয়েছে এবং আমি সব দেখতে পাচ্ছি।এই তো রাস্তার উপর আমি দাঁড়িয়ে আছি আর রাস্তার নিচেই আমার বাড়ি।এই তো দেখতে পাচ্ছি বাড়ির গেট। রাস্তা থেকে ঢালু একটি সরু।পথ নেমে গেছে বাড়ির গেট পর্যন্ত। আর আমি এখনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি।

আচমকা আমি পেছনে ঘুরে গিয়ে দেখতে পেলাম দু’জন লোক আসছে আমার পিছন পিছন। না, ভয় পাবার কিছু নেই, তারা মানুষই। ঠিক এমন সময় ভয়ংকর একটি দৃশ্য দেখতে পেলাম। হা! হতে পারে তোমার কাছে ভয়ংকর নয়, কিন্তু সেদিন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। আগেই বলেছি যে, উত্তর-দক্ষিণে লম্বা একটি ঘর আছে বাড়িতে। তার সাথেই ওয়াশরুম।

আমি দেখতে পেলাম টয়লেটের দিক থেকে ভয়ংকর একটি অশরীরী দ্রুত ধেয়ে আসছে আমার দিকে। ধবধবে সাদা কাপড় পরিহিত। দ্রুত বেগে এসে রাস্তার পাশে থাকা বাঁশ ঝাড়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে আবার সোজা দক্ষিণ দিকে চলে গেল।এতটাই সাদা ছিল যে,এমন অন্ধকারের মাঝেও আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম অশরিরীটিকে।

আমার পুরো দেহ হঠাৎ খুব ঝোড়ে একটি ঝাঁকুনি খেল এবং বরফের মত ঠান্ডা হয়ে গেল।ভাগ্য ভালো যে আমার মত ভীতু  প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম। ঐ দিনটার কথা মনে পড়লে আজও আমি অবাক হই যে, কীভাবে সেদিন আমি বাড়ি ফিরেছিলাম।

আমি ঠিক বুঝতে পারিনি যে,কেন সেদিন সেই অশরীরিটি আমার সামনে আসলো না এবং আমার কোন ক্ষতি করলো না। আমার মনে  সামনে আসার সাহস করে নি। আর হেফাজতকারী তো আল্লাহই, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ হাফিজ

সেদিনের পর থেকে আজো যখন রাতের বেলা রাস্তায় যাই বা রাতে কখনো বাড়ি যাই,বাড়ি পৌঁছার আগে আমার পা দু’টো অজানা শংকায় কেঁপে ওঠে। পা যেন আর চলতে চায় না। অবাক চোখে শুধু তাকিয়ে থাকি সেই স্থানটির দিকে আর স্বরণ হতে থাকে ভয়ংকর সেই রাতটির কথা।চোখের তারায় ভেসে উঠে অদ্ভুত,  রহস্যময় সেই দৃশ্যটি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ